শহরের বুকে তখন রাত প্রায় নয়টা। চারপাশের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে আসছে। রেস্টুরেন্টের কাউন্টার থেকে যখন শেষ পার্সেলটা হাতে নিলাম, তখন শরীর জুড়ে এক তীব্র ক্লান্তি। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে একটু অবাকই হলাম—খুবই সামান্য খাবার। এক প্লেট সাধারণ খিচুড়ি, সামান্য একটু দই, আর দুটো কলা।
ঠিকানাটা ছিল শহরের জরাজীর্ণ, পুরনো অংশে। স্যাঁতসেঁতে গলি পেরিয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছালাম, দেখলাম জীর্ণ এক বহুতল ভবন। লিফট নেই। এক বুক ক্লান্তি নিয়ে তিন তলার অন্ধকার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলাম। কলিংবেলের বোতামটা চাপতেই ভেতর থেকে এক জোড়া ধীর, অলস পায়ের শব্দ এগিয়ে এলো।
দরজাটা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা মা। ধবধবে সাদা চুল, চোখে মোটা কাঁচের চশমা, আর হাত দুটো কাঁপছে। তাঁর মলিন মুখের বলিরেখায় এক পৃথিবীর ক্লান্তি, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক মায়া। আমাকে দেখেই তিনি মলিন একটু হাসলেন। ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, “বাবা, খাবারটা একটু ভেতরের টেবিলে রেখে দাও না... হাত দুটো বড্ড কাঁপে।”
আমি ভেতরে ঢুকে টেবিলে খাবারটা রেখে যেই না চলে আসতে যাব, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক করুণ অনুরোধ ভেসে এলো— “দু’মিনিট বসবে বাবা? একা একা গিলতে আর ভালো লাগে না...”
কবজির ঘড়িটার দিকে তাকালাম। আমার ডিউটির সময় শেষ। সারাদিনের খাটুনিতে শরীরটা ভেঙে আসছিল। মন বলছিল চলে যাই, কিন্তু মায়ের বয়সী ওই বৃদ্ধার চোখের আকুলতা আমাকে বাঁধল। কেন জানি না, পা দুটো আর এগোল না। আমি বসে পড়লাম।
ঘরটা ছিল শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। দেওয়ালে ঝুলানো এক পুরনো ঘড়ির ‘টিক-টিক’ শব্দ ছাড়া আর কোনো প্রাণস্পন্দন ছিল না সেখানে। এক কোণে ছোট একটা ঠাকুরের ছবি, আর চারপাশের দেয়ালে ফ্রেমবন্দী অসংখ্য সাদাকালো ও রঙিন স্মৃতির কোলাজ।
বৃদ্ধা কাঁপতে কাঁপতে খিচুড়ির প্যাকেটটা খুললেন। খুব শান্ত, ধীর গতিতে এক-এক লোকমা মুখে তুলছেন আর প্রতি দু-এক লোকমা পর পর আমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসছেন, যেন কতকাল পর তিনি কোনো আপনজনকে পাশে পেয়েছেন। হঠাৎ শূন্যতায় চেয়ে বললেন, “জানো বাবা, আমি রোজ বাইরে থেকে খাবার আনাই না। আজ শুধু মনে হলো... একটা জ্যান্ত মানুষের গলার শব্দ শুনি। বড্ড একা লাগে।”
আমি নির্বাক হয়ে রইলাম। আমার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি দেয়ালের একটা ছবির দিকে আঙুল তুলে বললেন, “উনি আমার স্বামী। রেলে চাকরি করতেন। আজ পাঁচ বছর হলো আমাকে এই একা ঘরে ফেলে চলে গেছেন।”
তারপর পাশের একটা রঙিন ছবির দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখ দুটো ভিজে উঠল। ঠোঁটের কোণে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “এটা আমার ছেলে। কানাডায় থাকে। মস্ত বড় চাকরি করে, খুব ভালো আছে। প্রতি মাসে নিয়ম করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠায়।”
একটু থামলেন তিনি। চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল শুকনো গালে। ফিসফিস করে বললেন, “শুধু... কথা পাঠানোর সময়টা আর ওর হয় না।”
ঘরের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন আরও তীব্র হয়ে বুকে বিঁধতে লাগল। বৃদ্ধা আবার এক চামচ খিচুড়ি মুখে নিলেন। পাশের আরেকটি ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা আমার মেয়ে। বেঙ্গালুরুতে থাকে। নিজের সংসার নিয়ে খুব সুখে আছে। থাকুক... সন্তানরা যদি ডানা মেলে উড়তেই না শিখল, তবে এত কষ্ট করে মানুষ করলাম কেন?”
তাঁর কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো ক্ষোভ ছিল না। ছিল শুধু এক অতলান্ত শূন্যতা—যা শত কোটি টাকা দিয়েও পূরণ করা সম্ভব নয়। হঠাৎ তিনি সরাসরি আমার চোখের দিকে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মা আছেন বাবা?” আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ, আছেন।” “প্রতিদিন ফোন করো মাকে?”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এক তীব্র অপরাধবোধ আমার গলার কাছে এসে আটকে গেল। সত্যি বলতে, কাজের চাপ, মেসের ব্যস্ততা আর ক্লান্তির বাহানায় কতদিন বাড়ি ফোন করা হয় না! প্রতি রাতে ভাবি ‘কাল করব’, কিন্তু সেই ‘কাল’ আর আসে না।
আমার নীরবতা মায়ের মন ঠিকই বুঝে নিল। তিনি আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে খুব শান্ত গলায় বললেন, “মা-বাবারা সন্তানের টাকা গোনে না রে বাবা... ওরা শুধু চাতকের মতো অপেক্ষা করে সন্তানের একটু কণ্ঠস্বরের জন্য।”
কথাটা তীরের মতো আমার বুকে বিঁধল। খাবার শেষ করে তিনি এক ঢোক জল খেলেন। তারপর তাঁর আঁচল থেকে একটা পুরনো পার্স বের করে ৫০০ টাকার একটা নোট আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
আমি আমতা আমতা করে বললাম, “না না, আম্মা, এটা আমি নিতে পারব না। এটা তো আমার ডিউটি।” তিনি আমার হাতটা নিজের দু'হাতে চেপে ধরে বললেন, “নাও বাবা। এটা টিপস নয়। এই আধঘণ্টা সময় যে তুমি আমাকে একটা মানুষের পাশে বসে খাওয়ার আনন্দ দিলে—এটা তার দাম। আজ তুমি শুধু খাবার পৌঁছে দাওনি বাবা... তুমি এক নিঃসঙ্গ মায়ের কাছে একটু ‘সঙ্গ’ পৌঁছে দিয়েছ।”
টাকাটা হাতে নিয়ে আমি যখন দরজার দিকে এগোচ্ছি, তিনি পেছন থেকে আবার ডাকলেন, “আর শোনো—আজ বাড়ি গিয়ে মাকে অবশ্যই একটা ফোন করবে।”
নিচে নেমে এসে আমি আর বাইক স্টার্ট দিতে পারলাম না। বুকটা ফেটে কান্না আসছিল। কাঁপতে কাঁপতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে প্রথমেই মাকে রিং করলাম। ওপাশ থেকে মায়ের চিরপরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো, “কী রে বাবা? হঠাৎ এই সময়ে ফোন করলি? সব ঠিক আছে তো তোর?”
মায়ের ওই ব্যাকুল কণ্ঠটা শোনামাত্রই আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে এক নিঃসঙ্গ মায়ের হাহাকার আর নিজের মায়ের মমতা এক হয়ে মিশে গেল। গলাটা চেপে ধরে কোনোমতে বললাম, “হ্যাঁ মা... সব ঠিক আছে। শুধু তোমার গলাটা বড্ড শুনতে ইচ্ছে করছিল।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের এক নিরেট নীরবতা। তারপর মায়ের ডুকরে ওঠা কান্নার সুর টের পেলাম। মা বললেন, “খেয়েছিস তো বাবা?” রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সেদিন এক প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে শিশুর মতো কেঁদেছিলাম।
সেই রাতের পর থেকে একটা দিনও বাদ যায়নি যখন আমি মাকে ফোন করিনি। আর শুধু তা-ই নয়, আমার পেশাটাও বদলে গেল। প্রতিটি ডেলিভারি বক্স এখন আর আমার কাছে স্রেফ ‘অর্ডার’ রইল না। কোনো দরজার ওপাশে হয়তো ছটফট করছে ওষুধের যন্ত্রণা, কোনো দরজার ওপাশে হয়তো গুমরে কাঁদছে একাকীত্ব, আর কোনো দরজার ওপাশে হয়তো কেউ অপেক্ষা করছে শুধু একটা মানুষের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য। এখন আর আমি খাবার দিয়ে টাকা নিয়ে তাড়াহুড়ো করি না। দরজার ওপাশের মানুষটার চোখের দিকে তাকাই, জিজ্ঞেস করি, “ভালো আছেন তো?”
এর ঠিক দু’মাস পরের কথা। আবার সেই চেনা ঠিকানা থেকে একটা অর্ডার এলো। বুকটা খুশিতে ভরে উঠল। ভাবলাম, আজ আবার আম্মার সাথে দুটো কথা বলব। প্রায় দৌড়ে সেই তিন তলার সিঁড়ি ভাঙলাম। কিন্তু বেল বাজাতেই দরজা খুললেন পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রমহিলা।
আমি উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আম্মা কোথায়?” ভদ্রমহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মলিন কণ্ঠে বললেন, “আম্মা তো গত সপ্তাহে মারা গেছেন।”
মুহূর্তের মধ্যে আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন থমকে গেল। হাত দুটো খালি ছিল, তাও মনে হলো বুক থেকে খুব ভারী কিছু একটা ফসকে মাটির বুকে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল। ভদ্রমহিলা ভেতর থেকে একটা ছোট সাদা খাম এনে আমার হাতে দিলেন। বললেন, “তিনি মরার আগে বলে গিয়েছিলেন, যদি ওই ছেলেটি আসে, তবে তাকে যেন এটা দেওয়া হয়।”
কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা খুললাম। ভেতরে যত্নে ভাঁজ করা সেই ৫০০ টাকার নোট, আর একটা ছোট্ট চিরকুট। ঝাপসা চোখে অক্ষরের ওপর চোখ বোলালাম:
“বাবা, যদি তুমি এই চিঠিটা পড়ো, তবে বুঝে নিও আমি আর নেই। সেদিন আমার মতো এক নিঃসঙ্গ বুড়ির পাশে বসে খাওয়ার জন্য তোমাকে অনেক দোয়া। তুমি আমাকে শুধু খাবার দাওনি বাবা—মরার আগে একটু বেঁচে থাকার সম্মান দিয়েছিলে। আর হ্যাঁ... মাকে নিয়মিত ফোন করতে ভুলো না কিন্তু।
— ইতি, তোমার আম্মা।”
আজও সেই ৫০০ টাকার নোটটা আমার ব্যাগের সবচেয়ে ভেতরের পকেটে সযত্নে রাখা আছে। ওটা আমি কোনোদিন খরচ করিনি, কোনোদিন করবও না। ওটা আমার জীবনের সবচেয়ে দামী উপার্জনের স্মারক।
সেদিন আমি বুঝেছিলাম, প্রতিটি বন্ধ দরজার ওপাশে শুধু একজন ‘কাস্টমার’ থাকে না। কোনো কোনো দরজার ওপাশে একাকীত্বের নির্মম অন্ধকার থাকে, কোনো ওপাশে জীবনের শেষ মুহূর্তের আকুতি থাকে। আমরা সবাই এই পৃথিবীতে কোনো না কোনো ক্ষুধা নিয়ে বেঁচে আছি। কারও পেটের ক্ষুধা, কারও ওষুধের ক্ষুধা—আর কারও কারও ক্ষুধা শুধু দু’মিনিটের একটুখানি মায়া আর একটুখানি মানুষের সঙ্গের। মানুষ সবসময় শুধু টাকার ডেলিভারি চায় না—কখনও কখনও তারা শুধু চায় একটুখানি মানবিকতার উপস্থিতি।
আমি একজন ডেলিভারি বয়
(শিরোনামে একটি পোস্ট থেকে সংগৃহীত, সংযোজন ও সম্পাদনা: মোতাছিম বিল্লাহ)
এরকম লেখা পড়তে যুক্ত হতে পারেন: