অতীতের গল্পে হারিয়ে যাওয়া কত শত স্মৃতি, কোনটা মনে থাকে আর কোনটা মুছে যায়, মনে থাকে না। তবে কেউ যখন সেই হারানো দিনের কোনো কথা মনে করিয়ে দেয়, তখন সত্যি অবাক হয়ে যাই। একদিন এমনই এক স্মৃতি মনে করিয়ে দিল এই লেখার ৩য় গল্পের মানুষটি। সংশ্লিষ্ট আরও দুইটা স্মৃতি তার সাথে তুলে ধরছি।
১. অপরিচিত, তবে কাছের কেউএকদিন
পড়ন্ত বিকেলে ময়মনসিংহের জিরো পয়েন্ট ধরে হাঁটছিলাম। সময় কম ছিল, তাই হাঁটার গতি ছিল একটু বেশি। হঠাৎ সামনের দিকে খেয়াল করে দেখি,
এক সমবয়সী যুবক সোজা পথে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তার মুখটা চেনা
চেনা লাগলো না, কিন্তু সে আমাকে অবাক করে দিয়ে চেনাজানা প্রিয়
মানুষের মত সুন্দর করে সালাম দিয়ে বলল, "মোতাছিম ভাই,
কেমন আছেন?" তৎক্ষণাৎ থমকে গেলাম। হাঁটার
তাড়া থাকলেও একবার তার দিকে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করলাম মানুষটা কে? কিন্তু কিছুতেই
মনে পড়ল না তার পরিচয়। বিপরীত দিকে যেতে থাকা ছেলেটির হাঁটার ধরন দেখে মনে হলো,
সে যেন আমাকে এড়িয়ে চলতে চাইছে। আমিও ডাকার প্রয়োজন অনুভব করলাম
না। তবে তার সালাম আর আমার নাম ধরে সেই মিষ্টি সম্মোধন এখনো মনের গভীরে আঁকা হয়ে
আছে। কে জানে, আল্লাহ তাকে কোথায় রেখেছেন! তাকে মনে পড়লেই
একটুখানি দোয়া আসে মনে। সে আমার কাছে অপরিচিত হয়েও কাছের একজনের মতো হয়ে রইল।
সামান্য একটা বিষয়, কিন্তু আজও যখন আমি জিরোপয়েন্ট ধরে বাড়িতে যাই, তখন তার সেই
সালাম আর সম্মোধন আমাকে এক অজানা ভালো অনুভূতি উপহার দেয়।
২.
পৃথিবীটা গোল, একদিন দেখা হবে
আমার
শিক্ষা জীবনের শুরু ও শেষ নিজের প্রিয় শহর ময়মনসিংহে। তবুও মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসলে
যেন নতুন নতুন বিষয় উপভোগ করার সুযোগ হয়ে উঠে। ঢাকার কোনো মাদ্রাসায় ঢুকলেই হঠাৎ কেউ
নাম ধরে ডেকে বলে, "মোতাছিম!" অবাক হয়ে তাকালে
দেখি এক অচেনা মুখ। কুশল বিনিময়ের পর জানতে পারি, সে হয়তো
আমার বাবার ছাত্র ছিল। ছোটবেলায় বাবা যখন তাদের পড়াতেন, তখন
থেকেই আমাকে চেনে। কখনো আবার ময়মনসিংহ বড় মসজিদ, খরিচা, মাখযান মাদ্রাসার পুরনো
ছাত্র বা মসজিদের কেউ, যে আগে থেকেই আমার অবস্থা জানে।
এমন ঘটনায় আনন্দ হয় বৈকি! ঢাকায় থাকার আগ্রহও মাঝে মাঝে জাগে। কিন্তু এই শহরের
একটাই তিক্ত ও নিত্য দোষ—রাস্তার জ্যাম। কত রকম সুবিধার শহর ঢাকা, কিন্তু এই জ্যাম যেন সবকিছু ম্লান করে দেয়।
ঢাকার
জীবনে অভ্যস্ত হতে না পারার কথা শুনে সহপাঠীরা প্রায়ই আমাকে মজা করে বলে, "নতুন নতুন! তুমি এখনো নতুন। ঢাকা থাকার উপযুক্ত তুমি নও।" কথাগুলো
শুনে হাসি পেলেও কখনো কখনো মনে হয়, সত্যিই তো! আমি কি আদৌ
এই শহরের জ্যাম, কোলাহল আর ধোঁয়ার মধ্যে মানিয়ে নিতে পারব
নিজেকে? কিন্তু ঢাকার চমকপ্রদ স্মৃতিগুলো আমাকে ঢাকা
থাকার প্রতি উৎসাহিত করে। জানি না আল্লাহ রিজিক কোথায় রেখেছেন, যেখানেই থাকি না কেন, প্রিয়জনদের থেকে দূরে
থাকাটা হয়তো ততটা সহজ হবে না আমার জন্য। তবুও আমার ছোট্র অভিজ্ঞতায় বলব, একটা
লম্বা সময় ঢাকা কাটানো প্রয়োজন। দেশের সকল বিভাগ ও জেলার মানুষ থাকে ঢাকা, যা আপনাকে
মানুষের সাথে চলার নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা দেবে।
৩.
মধুর তিক্ততা বা অভিমান (প্রিয় স্মৃতিগুলোর একটি)
জীবনের
কোনো কোনো ঘটনা এমনভাবে মনে গেঁথে থাকে, যা বারবার মনে পড়লে
হাসি আর আফসোস একসাথে জাগে। ছাত্র জীবনের একটা অংশ, মিজান
জামাতের সেই স্মৃতিও আমার কাছে এমনই একটি গল্প। তখন বয়স ছিল মোটে পনেরো কিংবা ষোল।
একটুখানি ভুল বোঝাবুঝি, কিছুটা রাগ আর অভিমানের মিশেলে
তৈরি হয়েছিল একটি মধুর তিক্ততা। মধুর তিক্ততা মানে? যখন
ঘটেছে, তখন তিক্ত ছিল ঘটনাটি; পরে
মধুর হয়ে উঠেছে, এই আরকি। সে করেছিল অভিমান, আর আমি করেছিলাম রাগ—এটা স্পষ্ট। তো, অভিমানকারী
ভাইটির অভিমান করার কারণ ছিল তার সেলফ থেকে ইংরেজি নোট নিয়ে এসেছিলাম (নোট মালিকের
অনুমতি নিয়ে, তবে) তাকে (অভিমানকারীকে) না বলে; এমনটা কেন করলাম আমি, সে জন্য তার রাগ-অভিমান।
আমি তো নিজেকে নির্দোষ ভেবেই বসে ছিলাম, কারণ নোটের মালিক
আমাকে পড়ার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সে অভিমান করে আছে কেন আমি তার পড়া শেষ না হতেই
নোট নিয়ে আসলাম। যাইহোক, সে তার দুঃখটা সংশ্লিষ্ট বড়
ভাইদের ও অন্যান্য সহপাঠীদেরকে জানালো। তারা তাকে সান্ত্বনা দিল ঠিকই, সাথে সাথে তারা আমাকে চরমভাবে তিরস্কারও করলো, যেটা আমি ঐ সময় নিতে পারিনি। একপর্যায়ে আমার খুব রাগ হলো তার ওপর! কারণ
সবাই তার জন্য আমাকে কটু কথা শোনাচ্ছিল। একটা সময় আমার রাগ এতটাই বেড়ে গেল যে আমি
অভিমানকারী ভাইটির সাথে কথা বলতে নারাজ হয়ে গেলাম।
অভিমান
ভাঙানোর চিঠি
আমার
বন্ধুটি অভিমানী হলেও নিঃসন্দেহে আন্তরিক ছিল। সে আমার দূরত্ব বুঝতে পেরে নিজেই
লজ্জিত হলো। একদিন গভীর মমতায় আমাকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখতে বসল। চিঠি লেখার
দৃশ্যটা আমি দূর থেকে দেখছিলাম। সহপাঠীদের উৎসাহে আর নিজের উদ্যোগে সে সুন্দর করে লেখার
চেষ্টা করছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই দৃশ্য আমার রাগকে আরও বাড়িয়ে দিল। এমনটা কেন
হলো,
তা আমার জানা নেই। কিন্তু খুব রাগ হচ্ছিল আমার। আমি মনে মনে ঠিক
করলাম, চিঠি হাতে আসা মাত্রই সেটা ছিঁড়ে ফেলে দেব।
সহপাঠীদের কাছে সে হয়তো তার ইচ্ছা জানিয়েছিল যে, চিঠি
কাউকে দিয়ে পাঠাবে। কিন্তু বুঝতে পারলাম, তাদের পরামর্শে
সে নিজেই চিঠি নিয়ে আসতে বাধ্য হলো।
চিঠির
করুণ পরিণতি
সে
ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এল। সে যখন চিঠি নিয়ে আসছিল, তখন সবাই তার আর আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, আসলে
তারা চাচ্ছিল না—দুজন প্রিয় সহপাঠীর মাঝে এমন বিবাদ হোক। চিঠি হাতে ধরে তার চোখে
মমতা আর সংকোচের ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে এসে আমার সামনে কিতাবের ওপর চিঠিটি
রেখে দিল। কিন্তু আমার ভয়ানক রাগ তখন আর কোনো কিছু ভাবার সুযোগ দিল না। আবেগ মিশ্রিত
সেই চিঠি আমার রাগের স্পর্শে মুহূর্তেই অসংখ্য কাগজের টুকরোতে পরিণত হলো।
ক্লাসের
সবাই হতবাক! কেউই ভাবেনি যে আমি এমনটা করতে পারি। সে যখন চিঠিটি ছেঁড়ার দৃশ্য দেখল, হয়তো রাগ, লজ্জা কিংবা হতাশায় মাথা নিচু করে
চলে গেল। আমি তার দিকে একবারও তাকালাম না। কিন্তু সহপাঠীদের মন্তব্য শুনে
পরিস্থিতি অনেকটাই বুঝে আসছিল। "মোতাছিম! এটা কি করলে তুমি? তোমার এমনটা করা উচিত হয়নি, তুমি জানো সে কতটা
কষ্ট করে এই চিঠি লিখেছিল? মোতাছিম, তুমি তাকে কাঁদালে!?" ইত্যাদি অনেক কথায়
আমাকে ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিল—আমি হয়ত বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।
কিন্তু
সেই ঘটনা একটা ঐতিহাসিক স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল। আজও সেই কথা মনে পড়ে, আর আমার আফসোস হয়—হায়, কেন আমি তার চিঠিটা
একবারের জন্যও পড়লাম না। এই আফসোসটা তখন থেকে আরও বেশি হয় যখন থেকে জানতে পারি যে,
এই ঘটনা ঘটার আগে তাকে আমি দু-একটা চিঠি দিয়েছিলাম, যেগুলো সে খুব যত্ন করে রেখেছে এখনো। লেখার কালি ভিজে রঙিন হয়ে গেছে,
তবুও সেই চিঠি তার খুব যত্নে রয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে সেই অভিমানের
ঘটনার পর থেকে আমাদের সম্পর্কের গভীরতা আরো বেড়েছে।
উল্লেখ্য: সেই দিনগুলোতে চিঠি আর চিরকুট ছিল আমাদের আবেগ প্রকাশের সেরা মাধ্যম। ছোটখাটো রাগ ভাঙানো থেকে শুরু করে উস্তাদকে নিজের অন্তরের হালত জানানোর জন্য চিঠি ছিল অন্যতম হাতিয়ার। আজও সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। হয়তো সময়ের সঙ্গে আমরা বড় হয়েছি, কিন্তু সেই ছোট ছোট আবেগময় মুহূর্তগুলো আজও হৃদয়ের কোণে রয়ে গেছে। বন্ধুত্বের মিষ্টি অভিমান আর সেই কাগজের টুকরোগুলো জীবনের এক অনন্য গল্প হয়ে স্মৃতিতে জায়গা করে নিল। উপরোক্ত গল্প থেকে আমি যে কয়েকটা বিষয় বাস্তবে শিখেছি। সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য, অপরিচিত হলেও ভালো ব্যবহার মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে। যেমনটি প্রথম গল্পে উঠে এসেছে। রাগ বা অভিমান দীর্ঘায়িত না করে সমাধান করা উচিত এবং অন্যের অনুভূতিকে মূল্যায়ন করা উচিত। পুরনো স্মৃতি ও মূল্যবোধ কখনো কখনো সম্পর্কের গভীরতা শেখায়। তাই কিছু কিছু স্মৃতিগুলো ধরে রাখা চাই।
মোতাছিম
ডায়েরি
- দিনলিপি ১০-০১-২০২৫
