বইয়ের দোকানে
গেলে অসংখ্য বই চোখে পড়ে। কেউ বলেন সাহিত্য পড়ুন, কেউ বলেন ইতিহাস পড়ুন,
কেউ বলেন
আত্মউন্নয়নমূলক বই পড়ুন। আবার কেউ বলেন ধর্মীয় বই পড়ুন,
কেউ বলেন জীবনী
পড়ুন।
ফলে অনেকের মনে
একটি প্রশ্ন আসে—আমি আসলে কোন বই দিয়ে শুরু করব?
সত্যি বলতে,
বই পড়ার জন্য
কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটি ভালো বই
হাতে নেওয়া এবং পড়া শুরু করার ইচ্ছা।
তবে একজন নতুন
পাঠকের জন্য সঠিকভাবে শুরু করাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুরুতেই ভুল বই নির্বাচন করলে
অথবা নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিলে বই পড়ার আগ্রহ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তাহলে নতুন পাঠক
কীভাবে বই পড়া শুরু করবেন?
প্রথমেই নিজের
আগ্রহ খুঁজে বের করুন
বই পড়া শুরু করার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন—
আমি কোন বিষয় সম্পর্কে জানতে বা পড়তে
আগ্রহী?
আপনার যদি
ইতিহাস ভালো লাগে, তাহলে ইতিহাসের সহজ বই দিয়ে শুরু করুন।
সাহিত্য ভালো
লাগলে গল্প, উপন্যাস বা ছোটগল্প পড়তে পারেন।
ইসলাম সম্পর্কে
জানতে চাইলে সহজ ভাষায় লেখা নির্ভরযোগ্য ইসলামী বই দিয়ে শুরু করতে পারেন।
আত্মউন্নয়ন নিয়ে
আগ্রহ থাকলে নিজের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত বই বেছে নিন।
মনে রাখবেন, যে বিষয় আপনার আগ্রহ তৈরি করে,
সেই বিষয় দিয়ে
শুরু করলে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ হয়।
প্রথম বই হিসেবে
খুব কঠিন বই বেছে নেবেন না
নতুন পাঠকের
একটি সাধারণ ভুল হলো—শুরুতেই খুব বড় বা
কঠিন কোনো বই হাতে নেওয়া।
এতে কয়েকদিন
পড়ার পর বইটি আর ভালো লাগতে পারে না। তখন মনে হয়,
"বই পড়া আমার
জন্য নয়।"
আসলে সমস্যা বই
পড়ায় নয়; সমস্যা হতে পারে বই নির্বাচনে।
তাই প্রথম দিকে
এমন বই নির্বাচন করুন, যেটির ভাষা সহজ, বিষয় আকর্ষণীয় এবং আকার তুলনামূলক ছোট।
একটি ছোট বই শেষ
করার আনন্দ আপনাকে পরবর্তী বই পড়তে উৎসাহিত করবে।
প্রতিদিন অল্প
সময় দিয়ে শুরু করুন
বই পড়ার জন্য প্রতিদিন দুই-তিন ঘণ্টা সময় বের করার প্রয়োজন
নেই।
শুরুতে প্রতিদিন মাত্র
১০ থেকে ১৫
মিনিট পড়ুন।
আপনি চাইলে—
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর,
রাতে ঘুমানোর আগে,
নামাজের পর,
অথবা দিনের যেকোনো নিরিবিলি সময়ে পড়তে পারেন।
প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত
বেশি পড়া নয়,
নিয়মিত পড়া।
প্রতিদিন ১০ মিনিট পড়া একজন নতুন পাঠকের জন্য সপ্তাহে একদিন
এক ঘণ্টা পড়ার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।
একটি নির্দিষ্ট
সময়কে বই পড়ার সময় বানান
অভ্যাস তৈরি করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নির্দিষ্ট সময়
নির্ধারণ করা।
যেমন, আপনি যদি প্রতিদিন রাত ১০টায় ১৫ মিনিট বই পড়েন,
কিছুদিন পর
আপনার মস্তিষ্ক ওই সময়টিকে বই পড়ার সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করবে।
তখন বই পড়া আর আলাদা কোনো কাজ মনে হবে না;
বরং দৈনন্দিন
জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে যাবে।
মোবাইল থেকে
কিছুটা দূরে থাকুন
বই পড়ার সময় মোবাইল ফোন পাশে থাকলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন
হতে পারে।
একটি নোটিফিকেশন, একটি মেসেজ কিংবা সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিও আপনার মনোযোগ নষ্ট করে দিতে পারে।
তাই বই পড়ার সময় সম্ভব হলে মোবাইলটি Silent
Mode-এ রাখুন অথবা
কিছুটা দূরে রাখুন।
শুরুতে কঠিন মনে হলেও ধীরে ধীরে আপনি বইয়ের মধ্যে মনোযোগ
ধরে রাখতে পারবেন।
বই পড়ার সময়
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দাগিয়ে রাখুন
বই পড়ার সময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বা চিন্তা ভালো লাগলে
সেটি চিহ্নিত করে রাখতে পারেন।
তবে বই নষ্ট না করতে চাইলে আলাদা একটি নোটবুকে লিখে রাখতে
পারেন।
আপনি লিখতে পারেন—
আজকের শেখা বিষয়:
গুরুত্বপূর্ণ
ধারণা:
আমার মনে হওয়া
প্রশ্ন:
জীবনে কীভাবে
প্রয়োগ করব:
এভাবে পড়লে বই শুধু পড়া হবে না;
বই থেকে শেখাও
হবে।
বই পড়ার সময়
নিজেকে প্রশ্ন করুন
শুধু চোখ বুলিয়ে পড়লে সবসময় গভীরভাবে শেখা যায় না।
তাই পড়ার সময় নিজেকে প্রশ্ন করুন—
লেখক কী বলতে চেয়েছেন?
আমি কি বিষয়টি বুঝতে পেরেছি?
লেখকের সঙ্গে আমি একমত কি না?
এই কথাটি আমার জীবনে কীভাবে কাজে লাগতে পারে?
এই প্রশ্নগুলো আপনাকে একজন সক্রিয় পাঠক হতে সাহায্য করবে।
একটি বই শেষ
করার জন্য অতিরিক্ত চাপ নেবেন না
অনেকেই একটি বই শুরু করার পর মনে করেন,
যেভাবেই হোক
বইটি শেষ করতে হবে।
কিন্তু সব বই আপনার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ বা উপযোগী নাও
হতে পারে।
কোনো বই আপনার প্রয়োজনের সঙ্গে মিলছে না,
ভাষা খুব কঠিন
অথবা বিষয়টি আপনার জন্য উপযুক্ত নয়—তাহলে
সেটি আপাতত রেখে অন্য বই শুরু করতে পারেন।
তবে বই শুরু করলেই বারবার পরিবর্তন করার অভ্যাসও ভালো নয়।
চেষ্টা করুন অন্তত কিছুটা পড়ে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে।
একসঙ্গে অনেক বই
শুরু করবেন না
একজন নতুন পাঠকের জন্য একই সময়ে অনেক বই শুরু করা
বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
শুরুতে একটি বই বেছে নিন।
সেটি শেষ করুন অথবা যথেষ্ট অংশ পড়ুন।
তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী বই নির্বাচন করুন।
অভ্যাস তৈরি হয়ে গেলে একাধিক বই পড়ার অভ্যাসও গড়ে তুলতে পারেন।
বই পড়ার জন্য
একটি ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
আপনি চাইলে নিজের জন্য একটি সহজ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে
পারেন।
যেমন—
প্রথম মাসে ১টি বই।
পরের মাসে ১টি বা ২টি বই।
ধীরে ধীরে আপনার পড়ার ক্ষমতা ও আগ্রহ বাড়তে থাকলে লক্ষ্যও
বাড়াতে পারেন।
মনে রাখবেন, বছরে ৫০টি বই পড়ার চেয়ে ১০টি ভালো বই পড়ে
সেগুলো থেকে কিছু শেখা বেশি মূল্যবান হতে পারে।
বই পড়ে জীবনে প্রয়োগ
করুন
বই পড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য শুধু বই শেষ করা নয়।
আপনি যদি একটি বই পড়ে একটি ভালো চিন্তা গ্রহণ করেন,
একটি ভুল অভ্যাস
পরিবর্তন করেন অথবা একটি নতুন দক্ষতা অর্জন করেন—তাহলেই বই পড়া সার্থক।
তাই প্রতিটি বই শেষ করার পর নিজেকে প্রশ্ন করুন—
এই বই থেকে আমি কী শিখলাম?
আমার জীবনে এর কোন বিষয়টি প্রয়োগ করতে
পারি?
বই পড়াকে
প্রতিযোগিতা বানাবেন না
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলেন—আমি বছরে ৫০টি বই পড়েছি, কেউ বলেন ১০০টি বই পড়েছি।
এগুলো দেখে নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা করার প্রয়োজন নেই।
কারও পড়ার গতি বেশি হতে পারে, কারও কম।
আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত
নিজের জন্য
নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করা।
বই পড়া কোনো প্রতিযোগিতা নয়; এটি নিজের সঙ্গে নিজের একটি দীর্ঘ
যাত্রা।
একটি সহজ ৩০ দিনের
পাঠ পরিকল্পনা
আপনি যদি আজ থেকেই বই পড়া শুরু করতে চান,
তাহলে এই
পরিকল্পনাটি অনুসরণ করতে পারেন।
প্রথম ৭ দিন:
প্রতিদিন ১০
মিনিট পড়ুন।
৮–১৫ দিন: প্রতিদিন ১৫ মিনিট পড়ুন।
১৬–২৩ দিন: প্রতিদিন ২০ মিনিট পড়ুন।
২৪–৩০ দিন: প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট পড়ুন।
৩০ দিন শেষে আপনি হয়তো একজন নিয়মিত পাঠক হয়ে যাবেন না।
কিন্তু বই পড়ার সঙ্গে আপনার একটি সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হতে শুরু করবে।
আর সেই সম্পর্কই একদিন আপনাকে আরও বড় পাঠযাত্রার দিকে নিয়ে
যাবে।
শেষ কথা
বই পড়া শুরু করার জন্য নিখুঁত সময়ের অপেক্ষা করার প্রয়োজন
নেই।
আপনার হাতে এখন যে সময়টুকু আছে,
সেটুকু দিয়েই
শুরু করুন।
একটি ভালো বই নির্বাচন করুন।
প্রতিদিন অল্প কিছু সময় পড়ুন।
যা পড়ছেন তা বোঝার চেষ্টা করুন।
প্রয়োজনীয় বিষয় লিখে রাখুন।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পড়া বিষয়গুলো নিজের জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করুন।
মনে রাখবেন, একজন ভালো পাঠক একদিনে তৈরি হয় না।
প্রতিদিনের ছোট ছোট পাঠের অভ্যাসই একসময় একজন মানুষকে গভীর
পাঠক ও চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
তাই আজই একটি বই হাতে নিন। হয়তো আপনার
জীবনের নতুন একটি অধ্যায় সেখান থেকেই শুরু হবে।
