এ সম্পর্কিত কতিপয় হাদিস, “যে ব্যক্তি হালাল উপায়ে দুনিয়া অর্জন করে হাত পাতা থেকে বাঁচার জন্যে, সন্তান-সন্ততির সুখের চেষ্টা করার জন্যে এবং প্রতিবেশীর প্রতি দয়া করার জন্যে, সে পূর্ণিমার রাতের আলোর মত উজ্জ্বল চাঁদের ন্যায় মুখমন্ডল নিয়ে আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করবে।”
একদিন রসূলে আকরাম সা: সাহাবীগণের সাথে
বসে ছিলেন, এমন সময় জনৈক
যুবক,
সুঠাম কর্মতৎপর সাহাবীকে ভোরবেলায়
কাজকর্মে মশগুল দেখে সকলেই বলল: হায়, তার যৌবন ও কর্মতৎপরতা যদি আল্লাহর পথে ব্যয়িত হত।
রসূলুল্লাহ সা: বললেন, তোমরা এরূপ বলো না। কেননা, সে যদি নিজেকে হাত পাতা থেকে বাঁচানোর জন্যে কাজকর্ম করে, তবে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে। আর যদি সে নিজের বৃদ্ধ পিতা
মাতা ও দুর্বল শিশুদের খাতিরে কাজকর্ম করে, যাতে তারা অভাবগ্রস্ত না হয়, তবুও সে আল্লাহর পথেই ব্যস্ত রয়েছে। রসূলে
করীম সা: বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি অমুখাপেক্ষী হওয়ার জন্যে কোন কাজকর্ম করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে অবশ্যই পছন্দ করেন। আর যে ব্যক্তি মানুষের কাছ
থেকে খেদমত নেয়ার উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে অপছন্দ করেন। এক হাদীসে আছে- আল্লাহ তা'আলা পেশাজীবী ঈমানদারকে ভালবাসেন। আরও এরশাদ হয়েছে- মানুষ
যা খায়,
তার মধ্যে সর্বাধিক হালাল হচ্ছে তার
নিজের উপার্জন। এরশাদ হয়েছে- তোমরা ব্যবসাবাণিজ্য কর। কেননা, এতেই রয়েছে রিযিকের দশটি অংশের মধ্যে নয়টি। রিযিকের দশটি
অংশের মধ্যে নয়টিই রয়েছে ব্যবসায়। অথচ আমরা ব্যবসার চেয়ে চাকরিকে প্রাধান্য দিয়ে
থাকি। বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ: এক
ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি কাজ কর? সে বলল: আল্লাহ তা'আলার এবাদত করি। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন। তোমার ভরণ-পোষণ কে
করে?
সে বলল: আমার এক ভাই। তিনি বললেন: তোমার
ভাই তোমার চেয়ে বেশী এবাদতকারী। রসূলে করীম সা: এরশাদ করেন; আমার জানা মতে তোমাদেরকে
যেসব কাজ জান্নাতের নিকটবর্তী এবং দোযখ থেকে দূরবর্তী করে দেয়, সেগুলো সম্পাদনের আদেশ আমি তোমাদেরকে না দিয়ে ছাড়িনি।
পক্ষান্তরে আমার জানা মতে, যেসব কাজ
তোমাদেরকে জান্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দোযখের নিকটবর্তী করে, সেগুলো থেকে নিষেধ করতেও আমি কসুর করিনি। জিবরাঈল আ: আমার
মনে এ কথা জাগিয়ে দিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তি বিলম্বে হলেও তার রিযিক পুরোপুরি লাভ না করা
পর্যন্ত সে মৃত্যুবরণ করবে না; অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং উত্তম পন্থায় রিধিক অন্বেষণ
কর। এ হাদীসে উত্তম পন্থায় রিযিক অন্বেষণ করতে বলা হয়েছে। একথা বলা হয়নি যে, রিযিক অন্বেষণ করো না। হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে, বিলম্বে রিযিক প্রাপ্তি যেন আল্লাহর অবাধ্য হয়ে রিযিক
অন্বেষণ করার কারণ না হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলার কাছে যা আছে, তা তার অবাধ্যতার মাধ্যমে পাওয়া যায় না। এক হাদীসে এরশাদ
হয়েছে; খড়ির বোঝা পিঠে বহন করে জীবিকা উপার্জন করা কোন ধনী ব্যক্তির কাছে হাত পাতা
অপেক্ষা উত্তম; ধনী ব্যক্তি
কিছু দান করুক বা না করুক।
এ সম্পর্কে প্রসিদ্ধ বূযুর্গের উক্তি
রয়েছে, লোকমান হাকীম তাঁর পুত্রকে বললেন: বৎস, হালাল উপার্জন দ্বারা নিঃস্বতা দূর করবে। কেননা, যে ফকীর হয়ে যায়, তার মধ্যে তিনটি বিষয় সৃষ্টি হয়- এক. দ্বীনদারীতে তরলতা, দুই. জ্ঞানবুদ্ধির দুর্বলতা এবং তিন. ভদ্রতার অবসান। এই
তিনটি বিষয়ের চেয়েও মারাত্মক হল মানুষ তাকে ঘৃণা করে।
হযরত ওমর রা: বলেন: রিযিক অন্বেষণ থেকে
হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং আল্লাহ আমাকে রিযিক দাও এইভাবে বলা উচিত নয়। কেননা, তুমি জানো, আসমান থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্য বর্ষিত হয় না।
হযরত যায়েদ ইবনে সালামা নিজের ক্ষেতে
বৃক্ষ রোপণ করছিলেন। হযরত ওমর রা: তাঁকে দেখে বললেন: তুমি চমৎকার কাজ করছ। মানুষের
কাছ থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে যাওয়া উচিত।
হযরত ইবনে মসউদ রা: বলেন: যখন কাউকে দেখি
সে বেকার- দুনিয়ার কাজও করে না এবং দ্বীনের কাজও করে না, তাকে দেখে আমার খুবই খারাপ লাগে।
হযরত ইবরাহীম নখয়ীকে কেউ প্রশ্ন করলেন, সাধু ব্যবসায়ী আপনার কাছে অধিক পছন্দনীয়, না সেই ব্যক্তি, যে এবাদতের জন্যে মুক্ত হয়ে আছে? তিনি বললেন: আমি সাধু ব্যবসায়ীকে অধিক ভালবাসি। কেননা, সে জিহাদে লিপ্ত রয়েছে। শয়তান তাকে মাপে, কখনও ওজনে, কখনও গ্রহণে এবং কখনও প্রদানে ধোঁকা দিতে চায়। সে শয়তানের
সাথে লড়াই করে। তার আনুগত্য করে না।
রসূলুল্লাহ সা: একবার পশুপাখির আলোচনা
প্রসঙ্গে বলেন: পাখীরা সকাল বেলায় ক্ষুধার্ত উঠে এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ঘরে ফিরে।
উদ্দেশ্য, রিযিকের
অন্বেষণে পাখীরাও সকাল বেলায় এদিক ওদিক বেরিয়ে যায়।
আবু কালাবা রহ: এক ব্যক্তিকে বললেন; আমি
যদি তোমাকে জীবিকা উপার্জনে নিয়োজিত দেখি, তবে তা মসজিদের কোণে বসে থাকতে দেখার চেয়ে উত্তম।
ইমাম আওযায়ী রহ: হযরত ইবরাহীম আদহামের
সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখেন, তাঁর মাথায় খড়ির বোঝা। তিনি বললেন; হে আবু ইসহাক, এত পরিশ্রম করেন কেন? আপনার খেদমতের জন্যে তো আপনার ভাই-ই যথেষ্ট। হযরত ইবরাহীম
আদহাম জওয়াব দিলেন: হে আবু আমর, আমার সাথে এ ব্যাপারে কথা বল না। আমি শুনেছি, যে ব্যক্তি হালাল অন্বেষণে কোন অপমানের জায়গায় দাঁড়ায়, তার জন্যে জান্নাত নির্ধারিত হয়ে যায়।
আবু সোলায়মান দারানী রহ: বলেন; তুমি হাত
পা গুটিয়ে রাখবে, এবাদতে লিপ্ত থাকবে এবং
অন্য ব্যক্তি তোমাকে খাওয়াবে-পরাবে, আমাদের মতে এর নাম এবাদত নয়; বরং প্রথমে দু'রুটির চিন্তা কর, এরপর এবাদত কর।
মোটকথা: আমাদের উচিত্ নিজেদের সাধ্যমতো
উত্তম পন্থায় রিজিক এর জন্য পরিশ্রম করা এবং নিজ পরিবার-পরিজনের সকল সংকট নিরসনে
সময় দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আমল করার তৈফিক দান করুন।
